মহান নেতৃত্বদানের মডেল
যিশু শিষ্যদের সঙ্গে যে শেষ ভোজটি করেছিলেন তা ছিল নিস্তারপর্বের উদযাপন। এটি রীতিটি ছিল যে আনুষ্ঠানিক নৈশভোজে একজন দাস অতিথিদের পা ধুয়ে দেবে। এই কাজটি সাধারণত সবচেয়ে নিম্নস্তরের দাসকে দেওয়া হতো।
এই ভোজে, কেবল যিশু এবং তাঁর শিষ্যরাই ছিলেন। শুরুতে, কেউ এই পা ধুয়ে দেওয়ার কাজটি করেননি। শিষ্যদের মধ্যেও কেউ স্বেচ্ছায় এই কাজের জন্য এগিয়ে আসেননি কারণ তারা একজন দাসের অবস্থান নিতে চাননি। তাদের প্রত্যেকেই নতুন রাজ্যে একটি উচ্চপদের আশা করছিলেন।
আমরা কল্পনা করতে পারি যে পিতর যোহনকে আস্তে করে বলেছিলেন, “কারোর এই পা ধুয়ে দেওয়ার কাজটা করা প্রয়োজন; তোমার করা উচিত।” হয়ত যোহন উত্তর দিয়েছিলেন, “না, আমি মোটেই করব না; যাকোবের এটা করা উচিত।” তাদের মধ্যে কেউই একজন দাসের ভূমিকা পালন করতে ইচ্ছুক ছিল না। ভোজের শেষে, যিশু উঠে পড়েন, জল এবং একটা তোয়ালে নেন, এবং কাজ শুরু করে দেন। নিশ্চিতভাবে শিষ্যরা তখন লজ্জিত বোধ করেছিলেন।
পিতর প্রথমে যিশুকে তার পা ধোয়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তিনি এটি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে তিনি যিশুকে এতটাই সম্মান করেন যে তাঁকে এত নীচ কাজ করতে দিতে চান না। যিশু পিতরকে বলেছিলেন, “আমি তোমার পা ধুয়ে না দিলে, আমার সাথে তোমার কোনো অংশই থাকবে না” (যোহন ১৩:৮)। তাঁর জীবন ও মৃত্যুর মহান উদ্দেশ্যকে বোঝাতে তিনি এই ছোটো কাজটি ব্যবহার করছিলেন – অর্থাৎ পরিত্রাণ প্রদানের মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতির সেবা করা। তিনি অন্য আরেকটি সময়ে বলেছিলেন, “মনুষ্যপুত্রও সেবা পেতে আসেননি, কিন্তু সেবা করতে ও অনেকের পরিবর্তে নিজের প্রাণ মুক্তিপণস্বরূপ দিতে এসেছেন” (মথি ২০:২৮)। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে তিনি যে সেবা প্রদান করেছিলেন, তা তাঁর অন্যান্য অনেক সেবামূলক কাজের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছিল, যার মধ্যে সেই অনুষ্ঠানে পা ধুয়ে দেওয়াও অন্তর্ভুক্ত ছিল। যদি কোনো ব্যক্তি যিশুর সেবা গ্রহণ না করে, তবে সে যিশুর রাজ্যের অংশ নয়।
যিশু তাঁর শিষ্যদের পা ধুয়ে দেওয়ার পর তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আমি তোমাদের প্রতি কী করলাম, তা কি তোমরা বুঝতে পেরেছ?” (যোহন ১৩:১২)। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন যে জাগতিক সিস্টেমে লিডার সেবা পাওয়ার প্রত্যাশা করে। কিন্তু, ঈশ্বরের রাজ্যে, একজন লিডার সেবা করে (লূক ২২:২৫-২৭)।
নেতৃত্বদানের অর্থ হলো অন্যদেরকে সেবা করার জন্য প্রভাব ব্যবহার করা; এটাই হলো নেতৃত্বদানের সঠিক উদ্দেশ্য। যে ব্যক্তি লোকেদের চাহিদা পর্যবেক্ষণ করে এবং সেইসব চাহিদা পূরণের জন্য বিভিন্ন পথ খুঁজে বের করে, সে লিডার হবে। লোকেরা এমন কাউকে লিডার হিসেবে চায় যে তাদের ব্যাপারে যত্নশীল এবং তাদের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। মানুষ সেই ব্যক্তিকে ক্ষমতা দিতে ইচ্ছুক যে তাদের সুবিধার্থে ক্ষমতা ব্যবহার করবে।
কিছু সৈনিক কাঠের গুঁড়ি দিয়ে একটা বাড়ি তৈরি করছিল। তারা ভারী গুঁড়িগুলো তুলতে পারছিল না, এবং তাদের সার্জেন্ট তাদের উপরে চিৎকার করছিল। এক ব্যক্তি পাশ দিয়ে যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পুরো বিষয়টা লক্ষ্য করছিলেন। তিনি সেই সার্জেন্টের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনি সাহায্য করছেন না কেন?” সার্জেন্ট রেগে গিয়ে উত্তর দিয়েছিল, “আমি একজন সার্জেন্ট।”
লোকটি সৈন্যদের সাথে যোগ দেন এবং তাদেরকে গুঁড়িটা তুললে সাহায্য করেন, তারপর তার কোট খুলে তার ইউনিফর্ম দেখিয়ে বলেন, “আমি একজন জেনারেল।”[1] তিনি ছিলেন জেনারেল জর্জ ওয়াশিংটন (George Washington), যিনি পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।
একজন কাস্টমার একদিন সকালে একটি বড়ো ব্যাংকের বাইরে দাঁড়িয়ে ব্যাংক খোলার অপেক্ষা করছিল। এক ব্যক্তি আসেন এবং তার গাড়ি পার্ক করেন। সেই ব্যক্তি লক্ষ্য করেছিলেন যে পার্কিংয়ের জায়গায় কিছু আবর্জনা পড়ে আছে। তার বিল্ডিংয়ে ঢোকার পথে তিনি সেগুলিকে তুলে নেন যাতে তিনি সেগুলিকে ফেলে দিতে পারেন। যখন সেই কাস্টমার ভেতরে আসে, সে ওই আবর্জনা তুলে নেওয়া ব্যক্তিটিকে দেখতে পায়। কাস্টমারটি একজনকে প্রশ্ন করে, “এই লোকটি কে?” উত্তরটি ছিল, “উনি এই ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট।” যেহেতু প্রেসিডেন্ট ব্যাংকের সাফল্য এবং সুখ্যাতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন, তাই তিনি মাটিতে আবর্জনা পড়ে থাকতে দিতে পারেননি, যদিও তিনি একটি উচ্চপদে ছিলেন।
এমনকি জগতের নিয়মেও, সেবা করার আকাঙ্খা পদোন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যেখানে লোকেদের তাদের লিডার নির্বাচনের সুযোগ থাকে, তারা সেই ব্যক্তিকেই বেছে নেয় যাকে তারা তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম ও প্রস্তুত বলে মনে করে। একজন লিডার চাহিদার সমাধান দেওয়ার মাধ্যমে উঠে আসে – লোকেরা তার কথা শুনতে শুরু করে কারণ তারা দেখে যে সে যত্নশীল এবং তার নির্দেশনায় তাদের জন্য ভালো কিছু ঘটছে।
লিডারদের সেবা করার দায়িত্ব কিছু পদের উপাধিতেও স্বীকৃত হয়: উদাহরণস্বরূপ, গ্রেট ব্রিটেনের সরকারে সর্বোচ্চ পদ হল প্রধানমন্ত্রী, যার আক্ষরিক অর্থ হল “প্রথম দাস”। ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ লিডার তারাই ছিলেন যারা মানুষের প্রয়োজন মেটাতেন। পৃথিবীর লিডাররা সর্বদা সঠিক উদ্দেশ্য নিয়ে সেবা নাও করতে পারে, কিন্তু যিশুর একজন অনুসারীর স্বেচ্ছায়, নম্র হৃদয়ে এবং অন্যদের উপকার করার আকাঙ্খা নিয়ে সেবা করা উচিত।
একজন কলেজের অধ্যক্ষ বেশ কয়েকটি ব্যাগ নিয়ে তার অফিসে আসেন। যখন তিনি একজন শিক্ষার্থীকে সাহায্য করতে বলেন, শিক্ষার্থীটি উত্তর দেয়, “আমি একজন দাস নই।” অন্য একজন শিক্ষার্থী সঙ্গে সঙ্গে বলেছিল, “আমি সাহায্য করতে পারি; আমি একজন সেবক।” বহু বছর পর, দ্বিতীয় শিক্ষার্থীটি কলেজের অধ্যক্ষ হয়েছিল।